ARCHVILLE / স্থপতি পল্লী
১) প্রেক্ষাপট
একটা প্রশ্ন দিয়েই আলোচনাটার সূত্রপাত করা যাক। আচ্ছা বলুন তো একজন তরুণ স্থপতির কত বছরের কর্মজীবন অতিবাহিত হলে এই নগরীতে একটা এপার্টমেন্ট কিনতে পারবেন? বা এই দেশের যে কোনো নগরীর কথাই বলা হোক না কেন? পারবেন না তো? কারন, বর্তমান বাজার মুল্যের অবস্থার বিচারে হয়তো এক জীবনে সম্ভব নাও হতে পারে। আর তরুন স্থাপতি বলতে দেশের যুবসমাজকেও বুঝে নিতে পারি। তার হয়তো দরকার ছিল একটা ছোট ছিমছাম অ্যাপার্টমেন্ট, আনুমানিক ৬৫০ স্কয়ার ফিটের আশেপাশে। কিন্তু বাজারে এই মাপের একটা মান সম্মত এপার্টমেন্ট পাওয়াও দুষ্কর, দামের কথা না হয় বাদই দিলাম। দেখা যাক পৃথিবীর অন্যান্য দেশে একজন কর্মজীবী মানুষ কত বছর পেরুলে একটা কনডোমিনিয়াম এপার্টমেন্টের মালিক হতে পারেন (ছবি -১)। ইউরোপে দেখা যাচ্ছে ৭ থেকে ৮ বছরের মধ্যেই সে একটা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে পারছেন, এদিকে জাপান কিংবা হংকং এর দিকে তাকালে দেখা যায় ১৪ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে! যেখানে একজনের কর্মজীবন হয়ে থাকে ৩০-৩৫ বছর। মানুষ তার মেধা আর চিন্তাশক্তি, সহায়ক নীতিমালা প্রনয়ন করেই দেশটাকে গোছায়, মানববান্ধব পরিবেশ তৈরি করে, চাওয়া পাওয়ার সমন্বয় ঘটায়। মনে রাখতে হবে, ঐ তরুন স্থপতিদের সক্ষমতা ঠিকই আছে কিন্তু নেই সহায়ক পরিবেশ (enabling environment)। তাই কাজটা নিজেদেরই করতে হবে।
একবার ভাবুন তো একজন স্থপতি, যিনি নগরীর সবার জন্য নকশার পর নক্সা করে যাচ্ছেন, নান্দনিক সব আবাসন প্রকল্প বা এপার্টমেন্টের, তার মেধা, শ্রম আর সৃজনশক্তি নিয়োগ করে। কিন্তু তার কথা কি কেউ ভাবে? এ শহরে গড়ে উঠছে একের পর এক ভবন আর আবাসিক এলাকা - জলসিড়ি, ব্যাংকার্স টাউন, শিক্ষক নিবাস, রসায়ন পল্লী, প্রবাসী পল্লী, ডিওএইচএস, আরো কত কি। স্থপতিরা আগ্রহভরেই ডিজাইন করে যাচ্ছেন ওইসব এলাকায় বাড়ি-ঘর। তার নিজের বাড়িটা কবে হবে? বা আদৌ হবে কিনা? আশ্রায়ন তো রাষ্ট্রের একটা মৌলিক অধিকার! তাই এভাবে চলতে পারে না, দেয়া যায় না। আমাদের কিছু একটা করতেই হবে। এমনই একটা প্রত্যয় নিয়ে ২৫ তম ইসির নির্বাহী পরিষদ এক সভায় সিদ্ধান্ত নেন ‘স্থপতি পল্লী’ নামে একটা প্রকল্প করার বিষয়ে। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, স্থপতিদের জন্য আবাসন প্রকল্পের চাহিদার বিষয়টিও উঠে আসে বাৎসরিক সাধারণ সভায় (মুলতবি সভা) উপস্থিত সদস্যবৃন্দের কাছ থেকেই। আর তারই ফলশ্রুতিতে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবেই নির্বাহী পরিষদ বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করেন। সিদ্ধান্ত হয় যেহেতু বিষয়টি ব্যাপক ও বহুমাত্রিক তাই আপাতত একজনকে সদস্যকে আহবায়ক করে যাত্রা শুরু করা যেতে পারে, এবং সর্বসম্মতিক্রমে ১লা এপ্রিল ২০২৪ তারিখে ইসি একজন যোগ্য এক সদস্যকে এই দায়িত্ব প্রদান করে করে নিয়োগপত্র প্রেরণ করেন ।
২) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য(ক) প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে স্থপতিদের (তরুনদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে) জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করা যা কিনা নির্মাণ মূল্যের কাছাকাছি দামেই কেনা যাবে, তবে হতে হবে নান্দনিক ও মানসম্মত।
(খ) নির্মিত হবে একটা 'শহুরে পাড়ার' (Urban neighbourhood) পরিবেশে যেখানে গাছ-গাছালি আর আবাসস্থল এর একটা মেলবন্ধন থাকবে, তৈরি হবে একটা বিশাল পরিবেশ বান্ধব আরবান ব্লক।
(গ) সমাজের কাছে তুলে ধরা হবে আমাদের আবাসস্থল কেমন হতে পারে, যেখানে শুধু পৃথক পৃথক প্লটের সন্নিবেশ করেই আবাসন প্রকল্পগুলো হচ্ছে। সমাজের কাছে স্থপতিদের একটা দায়বদ্ধতা থেকেই তুলে ধরা হবে কেমন ভাবে ‘শহুরে পাড়া’ (urban neighbourhood) নির্মিত হতে পারে। পাওয়া যাবে দিক নির্দেশনা।
৩) রুপকল্প, কি ভাবা হচ্ছে?
ভাবতে পারি বড় একটা এলাকার মধ্যে বিস্তৃত হবে এই শহুরে পাড়া, হবে অভ্যন্তরীণ বাউন্ডারি ওয়াল বিহীন খোলামেলা গ্রিন ক্যাম্পাস। যেখানে থাকবে বিভিন্ন মাপের ও উচ্চতার এপার্টমেন্ট বিল্ডিং, থাকবে পার্ক, খেলার মাঠ, থাকবে বন-বনানী, থাকবে কৃষি জমি, খাল লেক কিম্বা পুকুর, থাকবে ওয়াটার ফ্রন্ট, ওয়াটার বাস বা বোটিং ব্যবস্থা। থাকবে আভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্য ইলেকট্রিক ভ্যান, সাইকেল লেন, কেন্দ্রীভূত পার্কিং ব্যবস্থা।
আরোও থাকবে শপিংমল, ফার্মার্স মার্কেট, পলি-ক্লিনিক, প্রাইমারি স্কুল, কো-ওয়ার্কিং স্পেস, বৃদ্ধাশ্রম, মসজিদ ও উপাসনালয়, রিটেল শপিং, ডে-কেয়ার সেন্টার ও সিভিক সেন্টার।
ভবনগুলো হবে আবাসিক ও মিশ্র ব্যবহারের। স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট, এক কামরা বিশিষ্ট এপার্টমেন্ট (1 BHK), দুই কামরা বিশিষ্ট এপার্টমেন্ট (2 BHK) অথবা তিন কামরা বিশিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট (3 BHK)। আরো থাকবে সামাজিক আবাসন ইউনিট্স (Social/ Shared Housing Units)। প্রয়োজন হবে নিজস্ব আর্বান ডিজাইন নীতিমালা এবং মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের পরেই সেই অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে ধাপে ধাপে।
৪) কথায় হতে পারে? কত বড় জমি লাগতে পাড়ে?
এই শহুরে পাড়া (Urban Neighbourhood) গড়ে তোলার জন্য খুঁজতে হবে শহরের খুব কাছেই বা আশেপাশেই একটি বড় জমি মেট্রো স্টেশন থাকবে কাছেই, থাকবে যাতায়াত সুবিধা। জমির পরিমাণ হতে পারে ৮০ থেকে ১০০ একর। ঢাকা শহরের পূর্ব সীমান্তের দিকে এমন জমি খুজে পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপারে অনেকে বলেছেন।
৫) এপার্টমেন্ট কিভাবে কেনা যাবে? বাজারে তো এপার্টমেন্টের দাম অনেক!
এপার্টমেন্ট কেনার ব্যাপারটা অভিনব হতে হবে, হতে হবে সহজ দীর্ঘমেয়াদী কিস্তিতে কিংবা ভাড়ার বিনিময়ে মালিকানা (Rent to Buy) নীতিতে। প্রকল্পে স্থপতিদের শ্রমের বিনিময়েও (sweat equity) অর্থায়নের কিছুটা মেটানোর ব্যাপারটা ভেবে দেখতে হবে। এখানে স্থপতিগণ অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে পারবেন নির্মাণ মূল্যের কাছাকাছি দামে, আর বাজার মূল্যে পাবেন সাধারণ জনগণ। এভাবেই ক্রস সাবসিডির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৬) অর্থায়ন কিভাবে হতে পারে?
অনেকভাবেই অর্থায়ন করার সুযোগ আছে,যেমনঃ
ক) রিয়েল এস্টেট ইনভেসমেন্ট ট্রাস্ট (REIT)* গঠনে করে, বন্ড বিক্রির মাধ্যমে।
খ) অনুদান বা ডোনেশন এর মাধ্যমে
গ) বৈদেশিক বা দেশীয় ইনভেসমেন্ট পার্টনারশিপ এর মাধ্যমে
ঘ) ল্যান্ড শেয়ারিং নীতিমালার মাধ্যমে
ঞ) স্বল্প সুদে ঋণ, যেমন গ্রিন ফান্ড
চ) বাণিজ্যিক মূল্যে সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে (অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্পেস, ক্লিনিক, শপিং সেন্টার, স্কুল ইত্যাদি)
*(https://www.tbsnews.net/economy/stocks/bsec-approves-rules-paving-way-real-estate-investment-820076)
* https://sec.gov.bd/crequest/Draft_on_the_BSEC_(REIT)_Rules_28.01.2024.pdf
৭) কিভাবে বাস্তবায়ন হতে পারে? বাস্থই এই বিষয়টা নিয়ে কোন পর্যায়ে আছে?
এখানে অনেক স্থপতি সদস্যের সংশ্লিষ্টার প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে অনেক সাব কমিটির, নেতৃত্বে থাকবে একটা স্টিয়ারিং কমিটি। প্রয়োজন হবে একটা চৌকস প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির (PIC) আরও থাকবে মাস্টারপ্ল্যান কমিটি,
ডিজাইন কমিটি, ল্যান্ড প্রকিউরমেন্ট কমিটি, অর্থায়ন ও ক্রেডিট ম্যানেজমেন্ট কমিটি, আইনি পরামর্শ কমিটি, সেলস কমিটি, মিডিয়া ও অ্যাডভার্টাইজমেন্ট কমিটি ইত্যাদি।
তবে সবার আগে প্রয়োজন হবে আইএবি এন্টারপ্রাইজের মত একটি বাণিজ্যিক সত্তা তৈরি করার। এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আওতায় স্থপতিপল্লী হবে একটি প্রকল্প।
সাধারণ সভায় ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, পরবর্তীতে বিষয়টির উপর ইসি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং কর্মকাণ্ডটির প্রারম্ভিকে আলাপ আলোচনা করে, মতবিনিময় করে একটি বিজনেস কেস তৈরির কাজটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন যোগ্য সদস্যকে আহবায়ক করে ইসির পক্ষে বিগত এপ্রিল ২০২৪এ পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। তৈরি করতে হবে সর্বজন গৃহীত স্বচ্ছ বরাদ্দ নীতিমালা। এসব কিছু প্রস্তুত হলেই বিষয়টি ইসির মাধ্যমে সাধারণ সভায় উপস্থাপন করা যাবে সবার অনুমোদনের জন্যে, কেবল তখনই প্রকল্পটি হাতে নেয়া যাবে।
আমাদের দেশের স্থপতি সমাজ একটা বিশাল সৃজনি শক্তি, তাঁরা নিজেরদের জন্যে কিছু করতে পারলে তা মডেল হবে দেশের মানুষের জন্য। এটাও তো অনেক!
"What is good for the bee, is good for the hive." Marcus Aurelius ( 61-180 CE)
বিভিন্ন ধারণা এবং সম্পুরক বিষয়গুলো নিয়ে আরও জানা যাবে লিংকগুলোর মাধ্যমেঃ
https://www.archdaily.com/1014159/social-spaciousness-mvrdv-reimagines-the-future-of-housing
Comments
Post a Comment